» হামহাম যাত্রা, অরণ্যকন্যা হামহাম

প্রকাশিত: ২২. জুলাই. ২০১৯ | সোমবার

হামহাম যাত্রা, অরণ্যকন্যা হামহাম

নাম তার হামহাম। হামহাম শব্দে পতিত হয় বলে নাকি এমন নাম। এই নামে আন্দাজ করা যায় এ এক বড়সড় ঝর্ণা। সে থাকে রাজকান্দী জঙ্গলের গভীরে পাহাড়ের কোলে। একেবারে দুর্গম সীমান্তে।

শেষ বার গিয়েছিলাম বছর আটেক আগে। আষাঢ়ের ঘনঘোর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে থকথকে কাদাজলে পাহাড় ডিঙানোর সেই স্মৃতি এখনো মাত্র জাগা কুঁড়ির মত সতেজ। জোঁকের মারাত্মক আক্রমণে সবার অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে শরীরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুসন্ধান চালানোর স্মৃতিও জ্বলজ্বলে। সেবার যাবার পথে এখন ভুলে যাওয়া কোন দেবতার নামে পণ করেছিলাম আর ওমুখো হচ্ছি না বেঁচে থাকতে। আর হামহাম দর্শন শেষে উল্টোরথে চড়ে বসেছিলাম। তখন পণ ছিল আবার আসতে হবে। সেটা কোমরের জোর থাকতে থাকতেই।

তারপর কিভাবে যেন এতগুলো বছর কেটে গেল। এর মধ্যে চষা হলো পার্বত্য অঞ্চল এবং দেশের বাইরে কিছু জায়গায়। কিন্তু প্রতিবেশী হামহামের কথা মনে এলেও ‘এখানে তো যেকোনদিন যাওয়াই যাবে’ চিন্তায় আর গা করা হয়নি। সাধে কি লোকে বলে ‘মক্কার মানুষের হজ্ব করা হয়ে উঠে না।’

এমনভাবেই হয়ত চলে যেত আরো কিছুদিন বা সব ক’টা দিন। কিন্তু ফেসবুক গ্রুপ বাঙ্গালের (https://www.facebook.com/groups/Bangaltravellers/) কারণে আবার যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হলো। আমরা উঠেপড়ে লাগলাম। ইভেন্টের মাধ্যমে শুরু হলো ‘অভিযাত্রী’ সংগ্রহের কাজ। পাশাপাশি চললো ট্যুর প্ল্যান আর যোগাড়যন্তর-আয়োজন। হাজার হোক, নিজেদের গ্রুপের প্রথম ইভেন্ট। বেশীরভাগের আবার ট্রেকিংএর অভিজ্ঞতা নেই। তাদের অসুবিধার বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমরা সব প্ল্যান সাজাতে লাগলাম। তার উপর একেকজন আসবেন একেক জায়গা থেকে। তাদের নিজের এলাকা থেকে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত যাবতীয় দায়িত্ব বাঙ্গালের। কাজ কম নয়। কিন্তু অসাধারণ দক্ষতায় সেগুলো সামলে নিলেন তাহমিনা আর রিপন। আমরা পুরো প্রস্তুত। পরদিন ভোর থেকে আমাদের ট্যুর।

অনেকদিন পর নতুন অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে কৈশোরের উত্তেজনা ভর করেছে। এর কারণে রাতে ঘুম হলো না। এদিকে ঢাকা থেকে আসা দলটির গাড়ি জ্যামে পড়ে মৌলভীবাজার আসতে ভীষণ দেরী করে ফেলল। সময় স্বল্পতায় আমাদের যাবতীয় প্ল্যান বদলে গেল। হামহাম ঝর্ণায় যাওয়ার আগে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক আর ছয়চিরি দিঘীতে ঘোরার প্ল্যান ছিল। আমরা এই দুটো বাদ দিলাম।

সবাই মিলে প্রস্তুত হয়ে যখন মৌলভীবাজার থেকে রওয়ানা হলাম, তখন ঘড়িতে নয়টারও বেশী বাজে। অনেক দেরী হয়ে গেছে। যদিও আকাশ রৌদ্রজ্জ্বল। তাই হামহামের পথ বেশ ভালো থাকার কথা। কিন্তু সিলেটের কিশোরী আকাশ কখন অভিমানে কেঁদে উঠে তা বলা যায় না। কতজন পরস্পর অপরিচিত বন্ধুকে নিয়ে জিপ ছুটে চলল কলাবনের পথে। রাস্তায় পড়ল কুরমা এলাকা। এখানে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী রূপকের সৌজন্যে সবাই মিলে চা খেলাম। তারপর এখান থেকে আমরা তুলে নিলাম অপেক্ষমাণ গাইড অভিজিৎকে। গাদাগাদি করে জিপ বয়ে নিয়ে চললো কলাবনে।

কলাবনে নামলাম এগারোটার দিকে। সেখানে হামহাম রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আজিজ ভাইয়ের কাছে দুপুরের খাবারের অর্ডার করে বাড়তি জামাকাপড় আর অন্যান্য জিনিস রেখে খুচরো কেনাকাটা করলাম। তারপর সবাই লাঠি কিনে জঙ্গলের পথ ধরলাম। আমাদের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পুরোটা পথ হাঁটতে হবে। দুই ঘণ্টার মত। আনন্দের বিষয় হচ্ছে কয়েকদিন বৃষ্টি না হওয়ায় হামহামের পথ খুবই ভালো। জোঁকের উপদ্রবও কম হওয়ার কথা। আমরা বেশ ভালোভাবে আগাতে লাগলাম।

ঘণ নিবিড় বন আর পাখপাখালির কলরবে বারবার মন হারিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু নিজেকে একেবারে ভুলে যাওয়ার উপায় নেই একদম। এক কাদাপিচ্ছিল পথ তো এই খাড়া বা ঢালু। এই রাস্তায় বসে থাকলে বিভূতিভূষণ হওয়া যায়। কিন্তু হাঁটতে বাধ্য হলে সাহিত্যের ভূত পালাবে।

ধীরেধীরে আমাদের শরীরে অনভ্যাসের যন্ত্রণা ভর করছিল। কেউকেউ পিছিয়ে পড়ছিল। আমি দলের সবার পেছনে থাকায় আমার আর পিছিয়ে পড়ার উপায় রইল না। যদিও আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমি পিছিয়ে পড়লে দল আরো পিছিয়ে পড়বে। আমি রীতিমতো ঘেয়ো কুকুরের মত নিজেকে টানতে লাগলাম। এসময় রূপক এসে আমার ব্যাগটা নিজের কাঁধে নিয়ে যেন প্রাণ দিল।

অর্ধেকটা পথ হেঁটে এসে একটা খাড়া টিলা পার হয়ে এসে দেখি একটা দোকান। বাঁশ দিয়ে বানানো অস্থায়ী দোকান। কলা জল আর কোমলপানীয় পাওয়া যায়। শুক্র আর শনিবারে ট্যুরিস্ট বেশী আসে বলে এই দুইদিনই শুধু দোকান খোলা হয়। জায়গাটা পরিষ্কার। জোঁক নেই। তাই এখানে বসে হালকা নাস্তা করলাম। আগের দিনের জ্বরটাও ফিরে আসছিল। প্রশান্ত ঔষধ দিলেন। খেয়ে আবার যাত্রা।

এরপরের পথটুকু খুব খাড়া আর ঢালু। উঠার সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আর নামার সময় ভারসাম্য রাখা যায় না। আমরা খুব ধীরগতিতে ধুঁকে ধুঁকে এগুতে লাগলাম। এরপর এলো ঝিরিপথ। জলের নিচে পাথুরে পিচ্ছিল পথ। সামান্য আছাড়পিছাড় খেয়ে সবাই মিলে আগাতে লাগলো। এরই মধ্যে ঝর্ণায় গর্জন কানে আসছে। জলের মধ্যে থাকায় ক্লান্তি কমছে। ঝর্ণার গর্জন শুনে পা আরো দ্রুত হলো।

তারপর মোড় ঘুরতেই সামনে দাঁড়িয়ে মহীয়সী হামহাম। সেই বুনো হামহাম, যে কিনা বনের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য বয়ে চলেছে বহুকাল ধরে। তার স্বচ্ছ জলধারা দুপুরের রোদে হীরার মত চমকাচ্ছে কালো পাহাড়ের দেয়ালে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। এ যেন বহুকাল পরে দেখা পাওয়া প্রেয়সীর মত। যাকে আলিঙ্গনের আগে দু’দণ্ড বসে দেখে নিতে হয়।

দলের অন্য সবাই পাগলের মত ঝর্ণাধারায় ভিজতে শুরু করেছে। আমিই বা দূরে থাকি কী করে? জ্বরের জন্য ভিজব না ঠিক করেছিলাম। কিন্তু মানুষ প্রতিজ্ঞা করে ভাঙ্গার জন্য। আমি হঠাৎ নিজেকে ঝর্ণার জলে আবিষ্কার করলাম। ভিজলাম, সাঁতার কাটলাম, ছবি উঠালাম। তারপর কাঁপতে কাঁপতে উঠে এসে একটা অস্থায়ী দোকানে দুর্দান্ত চা খেলাম।

এবার ফেরার পালা। ঝর্ণায় ভিজে শরীরের ক্লান্তি একেবারেই উধাও। সামনের খাড়াগুলোকে আর কোন ব্যাপারই মনে হচ্ছে না। আমরা খুব চমৎকারভাবে কোন সমস্যা ছাড়া উঠতে লাগলাম। আবার ফিরে এলাম পাহাড়ের মাথার দোকানটায়। এখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবার পথ চলা শুরু। এবার সবাই মিলে এক টানে একেবারে কলাবন।

কলাবনে জলের সঙ্কট। আমরা ঝিরির ঘোলাজলে হাত পা ধুয়ে খেতে বসে গেলাম। খাবারের মান তেমন ভালো বলা যাবে না। কিন্তু আমরা খিদের জ্বালায় বাধ্য শিশুর মত গোগ্রাসে গিললাম। তারপর আবার যাত্রা।

এবার আমরা যাচ্ছি মাধবপুর লেকে। যাওয়ার পথে দেখলাম পাত্রখোলা চা বাগানের সেই বিখ্যাত শ্মশান, যেখানে সব ধর্মের মানুষের শেষ ঠাঁই হয়। তারপর চা বাগান দেখতে দেখতে চলে গেলাম মাধবপুর লেকে। এখানে জলে নাওয়া হলো, চা পাতার চাটনি খাওয়া হলো। দেখা তো হলোই। সন্ধ্যেও যে হয়ে গেল। এবার ঘরে ফেরার পালা।

রওয়ানা হলাম। তখন শুনছি পেছনে এক চা শ্রমিক গান ধরেছেন-
ময়না ছলাক ছলাক চলে রে
পেছন পানে চায় না রে…

আমি পেছনে তাকালাম। উনি আধো আলোয় ঝকঝকে দাঁতের চমৎকার হাসি দিয়ে হাত নাড়লেন। আমি হাত নাড়লাম। মনেমনে বললাম-ভালো থেকো ভাই।

  • বিমান ধর, ট্রাভেলার & অনলাইন এক্টিভিস্ট।
Share Button

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪২ বার

Share Button

সর্বশেষ খবর

Flag Counter