শিরোনাম

» ইতিহাস-ঐতিহ্যে ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়

প্রকাশিত: ১৬. অক্টোবর. ২০১৯ | বুধবার

ইতিহাস-ঐতিহ্যে ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়

 

 

মো. রফিকুল ইসলাম :ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় সংক্ষেপে যাকে ডি. এম হাইস্কুল বলা হয়। ইহা পূর্ব সিলেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। বিদ্যালয়টি সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ১নং আলীনগর ইউনিয়নের টিকর পাড়া নামক স্থানে সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের পাশে একটি মনোরম স্থানে অবস্থিত। বিদ্যালয়টি বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত বিধায় উক্ত তিন উপজেলার ছেলে মেয়েরা এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এ কারণে বিদ্যালয়টিকে উক্ত তিন উপজেলার বাতিঘর বলা যায়। কারণ বিদ্যালয়টি উক্ত তিন উপজেলায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিদ্যালয়টি বিয়ানীবাজার উপজেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৫১ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এলাকার তৎকালীন কয়েক শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও এই মহান ব্যক্তিদের কেউ আজ বেচে নেই, তবুও এলাকার মানুষ আজও তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। বিদ্যালয়টি যারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের মধ্যে আছেন টিকরপাড়া গ্রামের মরহুম মুশফিকুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদপুর গ্রামের মরহুম আসদ আলী, একই গ্রামের মরহুম নূর উদ্দীন চৌধুরী, টিকরপাড়া গ্রামের মরহুম ই¯্রাব আলী, মরহুম সাজিদ আলী প্রমুখ। মরহুম মুশফিকুর রহমান চৌধুরী স্কুলের ভূমি দান করেছিলেন। পরে মরহুম ই¯্রাব আলী ড্রাইভার সাহেবও স্কুলের জন্য চার শতক জায়গা দান করেছিলেন। পরবর্তীতে এলাকার আরো অনেকেই বিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। তাছাড়া এলাকার সর্বস্তরের মানুষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যারা সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন, এর মধ্যে যারা পরলোকে চলে গেছেন তাদের সকলের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৫১ সালে আলী নগর গ্রামে জুনিয়র স্কুল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৬০ সালে বিদ্যালয়টি জায়গীরপাড়ায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৪ সালে বিদ্যালয়টি জায়গীরপাড়া থেকে টিকরপাড়ায় বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৫ সালে বিদ্যালয়টি উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশন লাভ করে এবং ১৯৬৭ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মহিউল ইসলাম জায়গীরদার ১১/১২/১৯৬৩ সালে প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং ২৬/১/২০০৪ইং পর্যন্ত দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। যেহেতু মহিউল ইসলাম জায়গীরদারের যোগদানের পরই বিদ্যালয়টি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয় এ কারণে তাকে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক বলা হয়। মহিউল ইসলাম জায়গীরদার একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে তার বিরাট অবদান রয়েছে। তিনি তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করেছেন। তিনি ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়কে তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষানুরাগী এবং বিত্তশালী ব্যক্তিদের নিকট বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সেগুলো সমাধানের জন্য অনুরোধ করতেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষানুরাগী ও দানশীল ব্যক্তিগণ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করেছেন এবং কেউ কেউ বিদ্যালয়কে আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন। তার চেষ্টায় বিদ্যালয়কে আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন। তার চেষ্টায় বিদ্যালয়ের অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান উন্নয়নে তিনি সর্বদা চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ও কর্মঠ শিক্ষক। এসব কারণে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে এবং তার সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। ২০০৪ সাল থেকে তিনি অবসরে আছেন এবং আমেরিকায় প্রবাস জীবন যাপন করছেন। মহিউল ইসলাম জায়গীরদারের অবসর গ্রহণের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন- রশিদ আহমদ চৌধুরী, মরহুম মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, মোঃ নজরুল হক এবং মোঃ আব্দুল মতিন। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ মাহফুজুর রহমান মোল্লা। তিনি বিগত ১৪/১/২০১০ইং হতে প্রধান শিক্ষক পদে আছেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং তিনি বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন।
এলাকার দানশীল ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ফাজিলপুর নিবাসী আলহাজ্ব তারা মিয়া খান বিদ্যালয়ে একটি টিনশেড ভবন তৈরি করে দেন এবং তিনি বিদ্যালয়ে আরো বিভিন্নভাবে আর্থিক অনুদান দেন। মোহাম্মদপুর নিবাসী মরহুম হাজী সিদ্দেক আলীর ছেলেরা বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করে দেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে কয়েকটি ভবন দান করা হয়েছে। বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। তার চেষ্টায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে কয়েকটি ভবন পাওয়া গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫/৮/২০১৯ইং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বিদ্যালয়ে একটি নতুন চারতলা ভবনের এবং বিদ্যমান একটি ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। প্রায় তেরশতের মত শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। বর্তমানে পঁচিশ জন শিক্ষক বিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সাথে শিক্ষাদান করছেন। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এই বিদ্যালয়ে বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও কানাইঘাট তিন উপজেলার শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই মেয়ে। তাই এলাকায় নারী শিক্ষার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই নারী শিক্ষায় বিদ্যালয়টির অবদান অপরিসীম। বিদ্যালয়টি যেহেতু গ্রামে অবস্থিত, সেহেতু কোন প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। তারপরও জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফল প্রশংসনীয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্তরিকতার সাথে শিক্ষাদান করছেন। যার ফলে দিন দিন শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টি বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, পড়া-শোনার মান, পরীক্ষার ফলাফল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি বিবেচনা করলে বিদ্যালয়টিকে পূর্ব সিলেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় বলা যায়। সবদিক বিবেচনা করলে বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ার দাবী রাখে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, অজ্ঞাত কারণে বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণের তালিকায় রাখা হয়নি। তাই অবিলম্বে বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করার জন্য জোর দাবী জানাচ্ছি।

Share Button

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯১ বার

Share Button
  • মঙ্গলবার ( সকাল ১০:২৪ )
  • ১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং
  • ১৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
  • ২৮শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( হেমন্তকাল )

সর্বশেষ খবর

Flag Counter